অনেক বছর আগের কথা। সুন্দরবনের মধ্যে ছিল এক গ্রাম। সেই গ্রামে বাপ হারা ছেলে দুখেকে নিয়ে বাস করতেন এক দরিদ্র রমণী। ফাইফরমাস খাটানোর নামে দুখে’কে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে নিয়ে যান দুখের জ্ঞাতি কাকা, পাশের গ্রামের দুই ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ধনা আর মনা।
নৌকা জলে নামার আগে দুখের মা দুখেকে বলেন, “বনে আমার মতো তোর আর এক মা আছেন। যখন কোনও বিপদে পড়বি তাঁকে ডাকবি। তিনি তোকে রক্ষা করবেন”। জলে ভাসলো মধুকরদের নৌকা। সুন্দরবনে সে সময় বাস করতেন গাজী নামে এক আউলিয়া। আর জঙ্গল প্রহরায় থাকতেন বাঘরূপী অপশক্তি দক্ষিণ রায় বা রায়মনি। সারা সুন্দরবনের একছত্র অধিপতি এই দক্ষিণ রায়। যেমন সুপুরুষ, তেমন দাপট তেমন অহঙ্কার। গাজী আউলিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ রায়ের বন্ধুত্ব ছিল।
ওদিকে, সুন্দরবনের নদীপথে ব্যবসায়ী ধনা আর মনার নৌবহর ভেসে চলেছে ভাটির টানে। দুখের কাজে মন নেই, মায়ের জন্য তার প্রাণ কাঁদছে। ধনা আর মনার ভয়ে ফেরবার কথা বলতে পারে না। এক রাতে ধনা আর মনার স্বপ্নে দেখা দেন দক্ষিণ রায়। ধনা আর মনাকে স্বপ্নে তিনি বলেন,” আমি তোদের দুই ভাইকে প্রচুর মধু আর ধন সম্পত্তি দেবো। তোরা দুখে’কে আমার কাছে উৎসর্গ কর। না হলে তোদের নৌকা ডুবিয়ে দেবো”।
লোভে আর ভয়ে ধনা আর মনা, দুখে’কে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ছল করে দুখে’কে একটি দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে পুকুর থেকে মিষ্টি জল নিয়ে আসতে বলে। সরলমতি দুখে নির্জন দ্বীপে নামে। ধনা আর মনা নৌকা ছেড়ে দেয়। দুখে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে।
হঠাৎ তার মনে পড়ে, মা বলেছিলেন, বনের ভেতর দুখের আর এক মা আছে। মায়ের কথা মতো দুখে তখন সেই বনের মা’কে স্মরণ করে। জলে জঙ্গলে আলোড়ন ওঠে। খুদে দুখের সামনে এসে দাঁড়ান অসামান্য রুপসী এক তরুণী বনবিবি, হাতে খোলা তলোয়ার। কোলে তুলে নেন দুখে’কে। সব শুনে তাঁর চোখদু’টি রক্তজবার মতো লাল হয়ে ওঠে।
দুখে’কে আদর করে অনেক ধনরত্ন দিয়ে কুমিরের পিঠে চড়িয়ে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। ক্রোধে আগুন বনবিবির আদেশে তখন বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে, বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বন্দি করে বনবিবির কাছে নিয়ে আসেন।
গাজী আউলিয়া, দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির চরণতলে আশ্রয় নেন। দক্ষিণ রায় উপায় না দেখে বনবিবির বশ্যতা স্বীকার করে নেন। তারপর থেকে আরবকন্যা বনবিবি সুন্দরবনের মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদায় পূজিতা হয়ে আসছেন শত শত বছর ধরে।


0 Comments