সেইদিন খুঁজলে পাবো আজও 
(শ্রুতি নাটক)
তুহিন শুভ্র মণ্ডল
প্রাককথন (ধারাভাষ্য) 
[বাংলায় তৃতীয় দফার লকডাউনও প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল। করোনা জিনিসটা কেমন এখনও সবাই বুঝতে পারি নি ঠিকই কিন্তু অভাব জিনিসটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। সে না হয় হোক। ঘরে ঘরে করোনা আটকানোর জন্য না হয় ঘরে ঘরে অভাবই মেনে নিলাম। নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো।]

(রান্না ঘর থেকে চেঁচিয়ে থালা বাসনের আওয়াজ সহ... ) 
সমীরণের স্ত্রীঃ অ্যাই শুনছো! বাবুর আর্ট টিচার অনলাইনে কি সব টাস্ক দিচ্ছে! ওসব আমি পারবো না ! হয় নাকি ধুত্তোর সারাদিন রান্না- বান্না! লকডাউন না তো যত জ্বালা আমার!

সমীরণঃ কেন কি হল আবার?

সমীরণের স্ত্রীঃ তুমি জানো না নাকি? আছো তো নিজের স্কুলের অনলাইন ক্লাসের দোহাই দিয়ে সারাদিন ফেসবুক নিয়ে পড়ে!

সমীরণঃ ভুল বলোনি। আমি স্বীকার করছি। 

সমীরণের স্ত্রীঃ জানি তো! আর আমি মরেছি এদিকে, নেই কাজের মাসি, নেই ...

সমীরণঃ রাগ করো না, এই ফেসবুক ঘাটতে গিয়ে সত্যি জানো এক নস্টালজিয়ায় আটকে গিয়েছি। অজয়কে মনে আছে তোমার?

সমীরণের স্ত্রীঃ থাকবে না আবার, দিল্লীতে চাকরি করে তোমার সেই বন্ধু। 

সমীরণঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও ফেসবুকে আমাদের ক্লাস নাইনের একটা ছবি দিয়েছে এই অ্যাই দেখো… আমি কোনটা বলতো?

সমীরণের স্ত্রীঃ দেখি দেখি…উঃ উঃ এই যে এই যে … বাবা কত বড় চুল ছিল তোমার! আর এই এটা কার ঘাড়ে হাত দিয়ে আছো তুমি? কোনও দিন দেখি নি তো।


সমীরণঃ ও তো দেবু। গ্রামের স্কুলে আমি -অজয় ছিলাম ছিলাম পড়াশুনোয় ভালো ছাত্র। কিন্তু খেলা ধুলায় দস্যিপনায় দেবু ছিল আমাদের মাস্টার। নবনী মাস্টারের বাড়ির গাছের পেয়ারা চুরি, কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতে সুনীল ময়রার গাছের ডাবের কাঁদি চুরি করতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গেছিলাম আর কি! উফ সেসব দিন কি আর ভোলার! আর সব কাজে আমাদের থাকতো দেবু। দিন দুপুর বেলা স্কুল পালিয়ে জেলে নৌকা খুলে সোজা জঙ্গলের পারে…

সমীরণের স্ত্রীঃ তো সে দেবু ঠাকুরপো আছে কোথায়?

সমীরণঃ আসলে ও বিয়ে করেছিল আমাদের থেকে অনেক আগে। পড়াশুনা বেশিদুর আর এগোতে পারে নি বাবার সংসারের হাল টানতে গিয়ে নিজের সংসারের হাল ধরে ফেলে। তা এতদিনে হয়ত ওর ছেলে মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। আন্দামানে গিয়েছিল কি একটা ফ্যাক্টরির কাজে ... ফিরে এসে একদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বলল পিয়ালিতে সংসার নিয়ে ঘর ভাড়া থাকে। এখন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে। চাষের সময় বাড়ি যায়। আমাদের বাড়িতে আসতে বলেছিলাম জানো! বলল তোরা চাকরি করিস, থাক গেলে তোদের বাড়ির লোকজন কি বলবে! এইসব... কথা না বাড়িয়ে মোবাইল নম্বর টা নিয়েছিলাম। পরে কল করেছি অনেকবার “নট রিচেবল” ছাড়া কিছু শুনলাম না। এই আকালের দিনে কি করছে কে জানে?

সমীরণের স্ত্রীঃ আজ এক বার করে দেখো না। 

সমীরণঃ ভালো কথা মনে করিয়েছ ... করে দেখি পাই কিনা।

সমীরণের স্ত্রীঃ তুমি কল করো। আমি দেখি দুপুরের রান্নার ব্যবস্থা করি...

সমীরণঃ ডি... ডি... দেবু... এই তো। 
( মোবাইলে করোনা সচেতনতার কলারটিউন বাজতে থাকে...)

হ্যালো। এটা কি দেবুর নম্বর! 

ওপার থেকেঃ অ্যাই কোথায় গেলে তোমায় কে ফোন করেছে...

সমীরণঃ বৌদি বলুন ওর ছোটবেলার বন্ধু সমীরণ...

ওপার থেকেঃ ও আচ্ছা ধরুন,ও আসছে।


দেবুঃ হ্যালো...

সমীরণঃ এই দেবু আমি সমীরণ বলছি... তোরা এখন কোথায় আছিস... খবর কি সব...

দেবুঃ আমি পিয়ালিতেই আছি।

সমীরণঃ কেন বাড়ি গেলি না কেন? 

দেবুঃ আমি তো কাজ করছিলাম তখন, লকডাউন যে এতদিন চলবে তখন তো বুঝতে পারি নি... প্রথম দিকে লকডাউন শুরু হলেও আমাদের কাজ চলছিল, ছুটি পেয়ে বাবুরা কাজ করাচ্ছিল... তারপর তো ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল ... আর কি করে বাড়ি যাব...

সমীরণঃ তাহলে চলছে কি করে?

দেবুঃ চলে যাচ্ছে... দুজন আছি এখানে। ছেলে-মেয়ে দুটো লকডাউনের আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল, ওখানেই আছে। আর আমাদের এখানে সবজি চাষ হয় তো, বাজারে জিনিসপত্রের দাম তোদের কোলকাতার থেকে অনেক কম। চাষিরা দূরে বিক্রি করতে পারছে না, তাই কাছের বাজারে কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে...
তোর তো গাড়ি আছে ফাঁক করে একদিন চলে অ্যায় এদিকে, বাজার করে নিয়ে যা... কোলকাতায় এখন সবজির যা দাম শুনি...

সমীরণঃ সে না হয় বুঝলাম, তো চাল-ডাল এসব?

দেবুঃ কাজ শেষ হলে ঠিকাদার টাকা দিয়েছিল, এখনও টাকা পাই দেবে দেবে বলে তো আর গ্রামে গেলাম না... টাকা পেয়ে কিনে এনেছিলাম বেশি করে চাল... এখনও তাই চলছে... দুটো পেট আর কত খাব?

সমীরণঃ কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যে বলল ১০০ দিনের কাজ, দিন মজুরির কাজ শুরু করতে দিতে...

দেবুঃ কাজটা হবে কি করে? কে করাবে? ৩২৫ টাকা বস্তা সিমেন্টের দাম এখন ৬০০ টাকা... কার দম আছে এত দামে মাল কিনে কাজ করানোর?

সমীরণঃ তাও তো বটে, গাড়ি তো বন্ধ... যাকগে তোর অ্যাকাউন্ট নম্বরটা দে...

দেবুঃ ধুরর আমার অ্যাকাউণ্ট কোথায়? বৌ যাদবপুরে যে বাড়িতে কাজ করত ওরাও বলছিল টাকা দেবে তা নেব কি করে?
সমীরণঃ এই পরিস্থিতি কাটবে কবে কেউ বলতে পারছি না। তুই পাশের বাড়ির কারোও নম্বরটা ওনাদের দে। আর আমাকেও। আর কলটা কাটবি না আমি অজয়কে কলে নিচ্ছি ধরে থাক… তোকে এভাবে শেষ হতে দেব না…
( কল হোল্ডের টিউন বাজতে থাকবে )

কলে অজয়কেঃ ফেসবুকে ছবি দিয়েই তো খালাস। শালা তুই তো আছিস ভালো, দেবুটা ওদিকে মরতে বসেছে।

অজয়ঃ আরে আমি তো ওকে… কতবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কোনও ভাবে পাই নি…

সমীরণঃ ও লাইনে আছে কানেক্ট করছি দাড়া…

কানেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গে শোনা যাবে দেবুর গলা, বৌকে বলছে…)
দেবুঃ আমাদের পাশের ঘরে ঐ টুলু আছে কিনা দেখো তো ওর কিসব অনলাইন টাকা দেওয়া নেওয়ার সিস্টেম আছে…

অজয়ঃ দেবু আমি অজয় বলছি, টাকার জন্য নয় রে শালা আমাদের সেই দিনটাকে বাঁচিয়ে রাখতে দিল্লী থেকে কল করছি।

সমীরণঃ অজয় শোন, এই দুর্দিনে দুটো টাকা ওকে কেউ পাঠাতে পারবে না। ওর কোনও অ্যাকাউন্টই নেই।

দেবুঃ আর বলিস না। সে করব করব করে আর করা হয় নি। আমাদের এখানে স্টেট ব্যাঙ্কে একবার ফর্ম তুলেছিলাম, তো লেখাপড়া ছেড়েছি আজ… ঐ ফর্ম পূরণ করব তারপর তো জমা দেব… আর ব্যাঙ্কের লোকরা যা… 

অজয়ঃ তুই আজ একবার যা, তোদের ওখানকার ব্যাঙ্কের এখন যে ম্যানেজার, ও আর আমি এক ব্রাঞ্চে দুবছর আন্দামানে পোস্টিং ছিলাম। আমি ফোন করে দিচ্ছি। গিয়ে শুধু আমার নাম বলবি… আর শোন আধার কার্ডটা নিয়ে যাবি। অ্যাকাউন্ট নম্বর হয়ে গেলে আমায় কল করবি।

সমীরণঃ কতদূর তোর ওখান থেকে ব্যাঙ্ক?

দেবুঃ খুব দুর নয়… সাইকেলে চলে যেতে পারবো… কিন্তু এখন ব্যাঙ্কে তো খুব ভিড়!

অজয়ঃ সে হোক তুই ওখানে পৌঁছে আমায় কল করবি। আজ তোর অ্যাকাউন্ট হবে জানি… আর আমি সমীরণ সবাই ওতেই টাকা পাঠাবো, তারপর সেই টাকা তুলে তারপর ফিরবি। তাড়াহুড়োর কিছু নেই, খেয়ে দেয়ে বের হ…

সমীরণঃ হম… তার আগে তুই আমার নম্বরটা সেভ কর, অজয় তুইও তোর নম্বরটা দিয়ে দে… না হলে ব্যাঙ্কে গিয়ে পাবে না। 

অজয়ঃ আমি তোর থেকে দেবুর নম্বর নিয়ে নিচ্ছি। সব মিটে গেলে আমি কোলকাতা ফিরলে একবার সবাই দেখা করে আবার পুরানো দিনে ফিরে যাবো।

দেবুঃ তোদের এখনও আমাদের সেই দিন গুলোর কথা মনে করায়…

সমীরণঃ করাবে না? তুইও এভাবে আমাদের থেকে পৃথক হয়ে চলতে পারবি না। আধুনিক বিশ্বে যেখানে সব কিছু হাতের মুঠোয় সেখানে এই সামান্য বাধা তো কিছুই নয়…

অজয়ঃ একদম।

সমীরণের স্ত্রীঃ মনে হচ্ছে বন্ধুকে পেয়ে গেছো… ( রান্না ঘর থেকে)

সমীরণঃ শুধু বন্ধু নয়। আমাদের সেই ছোটবেলাটাই পেয়ে গেছি ( এটা জোরে বৌকে শুনিয়ে), কি বলিস সবাই ( এটা ফোনে) … তোমায় পরে সব বলছি…( এটা আবার জোরে বৌকে শুনিয়ে)  

দেবুঃ (কান্না সহযোগে) আমি কোনদিন ভুলি নি… তোদের কথা… আজকের কথাওজীবনে ভুলতে পারবো না।

অজয়ঃ ছাড়, তুই ব্যাঙ্কে যা আগে… একদিন দেখা হবেই… সেদিন!

সমীরণঃ একদিন দেখা হবেই… সেদিন!

দেবুঃ (স্বরটা স্বাভাবিক করার পর) হম, একদিন দেখা হবেই… সেদিন!

সমাপ্তি মিউজিক দিয়ে শেষ। 

_______