স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার,তবুও শুনছি লোকের প্যাঁক্
লেখনীঃ তুহিন শুভ্র মণ্ডল
চেনা ছবি,চেনা লোকের ক্যামেরায় আবার চেনা লোকের ফালতু বক-বকানি৷ হ্যাঁ সত্যিই তাই এ ছবি পড়ে থাকা পোড়া রুটির মত মর্মান্তিক নয় আবার ফেসবুক পেজের সুদৃশ্য কাপে সাজানো ডালগোনা কফির মত আহ্লাদেরও নয়৷ এ আমাদের সোনারপুরের ছবি৷
সকালে করোনা পরিস্থিতিতে যতটা জটলা এড়িয়ে বাজার করা যায় তা করে নিয়ে মোড় সোনারপুর এখন বাকিটা সময় কেমন থিতু হয়ে পড়ে৷ কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের কি শেষ আছে! কেউ ওষুধ কিনতে বাজারে যাচ্ছে, আবার কেউ রেশন কার্ড ঠিক করতে যাচ্ছে আবার কেউ ত্রাণ তুলতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার খোঁজে৷ বয়স্ক ও বাচ্চাদের ডাক্তার খানায়,ল্যাবরেটরি যেতে হচ্ছেই৷ টাকার কল ব্যাঙ্ক,এটিএম তো আছেই৷এছাড়া চা প্রেমীরা তো আছেনই৷ মূল বাজার বন্ধ থাকলেও একটু দুরে চায়ের দোকান অল্প করে খোলা, মানে চাইলে পাবেন৷ সন্ধ্যার পর সুরাপায়ীদের দেখা আপনি পাবেনই পাবেন৷ ভাবছেন দোকান তো বন্ধ! না না চিন্তমনি আছেন তার জন্য৷ তবে মোটের উপর সেই দিন আজ আর নেই৷ সোনারপুর সন্ধ্যার পরে এখন তাঁর সোনার জৌলুস হারিয়ে কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে অন্ধকারে ডুবে গেছে৷
স্বপ্ন দেখানোর স্বপ্নময় জগৎ ছিল এই সোনারপুর৷ এককালে বহু ছেলে মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে বোম্বে চলে যেত নায়ক-নায়িকা হবার স্বপ্ন নিয়ে৷ সবার না হলেও কারোও কারোও স্বপ্ন তো সত্যি হতই৷ সেরকম আমাদের সোনারপুরও৷ কত ছেলে মেয়ে নিজের ডাক্তার,ইঞ্জিনীয়ার,শিক্ষক,আমলা হবার স্বপ্ন নিয়ে মেসে থাকে এই সোনারপুরে৷ গ্রামের চাষের মায়া ত্যাগ করেও উচ্চ আয়ের স্বপ্ন নিয়ে সোনারপুরে খাটতে আসেন বহু মানুষ৷ রান্নার কাজ, ভ্যান চালানো, রাজ মিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ করেও তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে চান তারা৷
রাধানগরের বাসিন্দা স্বপন( প্রতিকী নাম) শিক্ষিত ছেলে৷ কাজ করতো কন্টাকচুয়ালে কোলকাতার এক নামি কোম্পানিতে৷ কিন্তু মার্চ মাসের মাইনে এলেও কোম্পানি জানিয়ে দিয়েছে এপ্রিলে আর হবে না৷ আর নতুন কাজ খোঁজার পরিস্থিতি এখন আর নেই৷ অগত্যা এক বন্ধুর মেশিনে সারারাত বসে তৈরী করেন কাপড়ের মাস্ক৷ আর তার সঙ্গে কিছু কাপড়ের গ্লাভস্ কিনে সাইকেলে ফেরি শুরু করেছে স্বপন৷ করোনা থেকে বাঁচতে যা হাতিয়ার পাওয়া যায় তাই কিনছেন মানুষ৷
তিন-চারশো টাকা দিয়ে এন নাইন্টি ফাইভ মাস্ক সবাই কিনবেন না তবুও কিছু তো চাই করোনা আটকানোর জন্য৷ তাই স্বপনের প্রোডাক্ট দেদার বিকোচ্ছে৷ স্বপনকে জিজ্ঞাসা করে বুঝলাম আহ্লাদ নেই মনে তার ৷ বলল "আমি যে বাঁচার পথ খোঁজার চেষ্টা করছি মাত্র ,এটা বোঝার লোক নেই৷শুধু ইর্ষায় মরছে সবাই , বলছে এই সময়ে নে কামিয়ে নে৷ আবার অনেকে বলছে যে ব্যবসা ধরছিস সারাজীবন চলবে৷ তবে এই সময়ে ইনকাম করতে পারার জন্য তাচ্ছিল্যই বেশি৷"
জিজ্ঞাসা করেছিলাম তোমার কি চিন্তা ভাবনা , বলল "এ কাজ বেশিদিনের নয়, কিছুদিনের মধ্যেই বড় বড় কোম্পানি আসছে ,তারা একদিনে মেশিনে হাজার হাজার মাস্ক তৈরী করবে,আবার বিক্রিও করবে অনলাইনে ফ্লিপকার্টে তখন আমরা আর থাকবো না৷"
সব মিলিয়ে স্বপনের স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার হচ্ছে তা বোঝাই গেল৷
দুপুরের চড়া রোদে আপনি সাইকেলে সবজি নিয়ে ঘুরতে দেখবেন আমিরুলকে (নাম প্রতিকী) ৷ তেমাথায় বাড়ি৷ বাবা মাছ নিয়ে বেরোয় তবে রোজ মাছ পায় না৷ ও এবার মাধ্যমিক দেবে৷ তবে বাঁচলে তো সব৷ তাই এই অবস্থা৷ আপনারা যারা শিক্ষক আছেন তারা অনেকেই অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে হতাশ হয়ে বলছেন৷ ১০০ জন ছাত্র ছাত্রীর মধ্যে মাত্র ৩২ জন উপস্থিত৷ ভাবছেন বাকিরা কোথায়? বাতিদের কিছু আছে এই সব সাইকেলে গলির মধ্যে মধ্যে৷ মাঝে মাঝে হাঁক দিয়ে দোতালা থেকে নামিয়ে আনছেন আপনাদের আর হাতে তুলে দিচ্ছে আপনার পছন্দের সবজি৷ আমিরুল নিজের স্বপ্নকে প্রতিদিন দুরে সরাতে বাধ্য হচ্ছে৷ জিজ্ঞাসা করলাম ওর খবর " বাবা রোজ মাছ আনতে পারে না, মায়ের কাজটাও এখন নেই, আমি ,ভাই,বোন সবাই কি না খেয়ে মরব নাকি! বেঁচে থাকলে তো পড়াশুনো৷ তবে কেউ আমি কোন ক্লাসে পড়ি, কেন এসব করছি , এই সময় ভালো কামাচ্ছি ,এসব ....জিজ্ঞাসা করে৷ তবে বাচ্চা বলে কিছুক্ষণ সবাই অনুগ্রহ করে বটে তবে সবাই নয়৷"
বয়সে একটু উপরে৷ বালিগঞ্জে জলের দোকান ছিল৷ ভালোই চলত৷ দুই ছেলে মেয়েকে পড়িয়ে ধার দেনা করে সোনারপুরে দুরের দিকে জমি কিনে বাড়ি শুরু করেছিল৷ এখন এই অবস্থা৷ সাইকেলে চা নিয়ে যে দোকানদাররা নির্জনে বসে আছেন তাদের কাছে চলে যাচ্ছেন আর প্রয়োজনে রাস্তায় বেরোনো চা প্রেমী লোকেদেরও চিনে ফেলেছেন এই কদিনে৷ সাইকেলে লাল আলতা দিয়ে বোর্ডে লিখে রেখেছেন "দুরত্ব বজায় রাখুন,সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন" ৷ আমাদের ভালো রেখেও নিজে ভালো থাকতে পারছেন কিনা শুনতে গিয়ে নিরাশ হলাম ৷ বললেন " লোন নিয়েছিলাম ১ লাখ টাকা একটা বেসরকারি ব্যাঙ্ক থেকে , ইনকাম ছিল তো তখন, এখন ইএমআই দিতে পারছি না৷ যা টাকা ছিল ওই বাড়ির করার জন্য মাল কিনেছি৷ কিন্তু ব্যাঙ্ক থেকে ফোন করছে ইএমআই এর জন্য৷ কি করব! এভাবে চা বেচে যদি কিছু হয়! কিন্তু আত্মীয় স্বজনের কাছে আর কিছু চাইতে পারছি না তাই আর কি! "
মোটের উপর স্বপ্ন গুলো ভেঙে চুরমার হচ্ছে এটা চোখের সামনে দেখতে না পেরে যারা বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা বাস্তবিক মানবিকতা পাচ্ছেন না সবার কাছ থেকে৷
ভাবুন ৷ মতামত জানান৷

2 Comments
মাসের শেষ সপ্তাহে লকডাউন হওয়ায় মানুষ জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ পায় নি। পথে পথে মানুষ সাইকেলে ডিম, মাছ, বেকারী জিনিস, সব্জি, চা, মাক্স, ফল বিক্রি করছে। এক ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখে ভারতবর্ষের মানুষ।
ReplyDeleteঅন্যদিকে পরিযায়ী মানুষ ৪০০ থেকে১২০০ কিমি পায়ে হেঁটে চলেছে! এ কোন ভারতবর্ষ!
সবাই সম্মান দেবে আশা করাটাই ভুল। তবে লড়ে যেতে হবে। এ লড়াই জিততেই হবে। প্রত্যেক কে বলছি সাবধানতা অবলম্বন করে বাঁচার লড়াই লড়ে যান। যে কোন সমস্যায় আমাকে ফোন করবেন পাশে থাকবো। 7044664552
ReplyDelete